Showing posts with label স্মৃতিচারণ. Show all posts
Showing posts with label স্মৃতিচারণ. Show all posts

Monday, July 9, 2018

ঘুরপাক

দুপুরের নরম রোদটা পড়েছিল খাটটার উপর, বারান্দার খোলা দরজা দিয়ে।

সেদিনও এরকমই ছিল না, দুপুরটা?

চড়ুইগুলো খাবার খেয়ে গেছিল কিছুক্ষণ আগেই।

বারান্দায় কিচিরমিচির গুলো বন্ধ হবার পরে তখন নিঃশব্দ চারিদিক।

শুধু ঝিরঝিরে পাতার শব্দ ছিল, সুপুরি গাছটার।

কঙ্কালসার শরীরটা বিছানায় মিশে গেছিল প্রায়।

হালকা শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ ছিল একটা।
.
.
.
ঝিরঝিরে পাতাগুলোও থেমে গেছিল আর খানিক পরে।

কালো মাকড়সাটা ঘর পেরিয়ে চলে গেছিল বারান্দায়।

শুধু একটা প্রশ্ন রয়ে গেছিল - "আমি এখন কি করি!"
.
.
.
আজও ঘরময় ঘুরপাক খায়, প্রশ্নটা।

চড়ুইগুলো আর আসেনি।

Monday, May 11, 2015

একফালি রোদ

“আজকাল এত যে কি ভাবো তুমি, দাদা!! সেই কখন থেকে বইটা মুখের সামনে খুলে বসে আছো, পাতাটা পর্যন্ত উল্টোওনি।”

দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বইটা ভাঁজ করে পাশের ছোট টেবিলটায় রাখলাম। আর পড়া হবে না এমনিতেও, ঝুমুর বকতে শুরু করলে ক্ষান্তি দেবে না।

ঝুমুর আমার ঘরের বারান্দায় রাখা অনেকগুলো গাছের মধ্যে একটা ছোট বনসাই ঝাউ গাছ। বছর চারেক হবে ওকে লাগিয়েছি এখানে। গাছের সঙ্গে কথা বলাটা হয়ত ভীমরতিই হবে, তবে বয়েসও তো হয়েছে। এই সামনের মাসে ৪৭ হবে।
তবে, আজকাল আর অত ভাবিনা, ভীমরতি হলেই বা আর কি করা যাবে।

“না ভেবে আর উপায় কি, নাহলে তো তুই বকে বকে আমার কানের পোকা বার করে দিবি”।

“ওওও, আমি তো শুধু বকি, তাই না!! এখন তো বলবেই!”

ঝুমুরের হাবভাব অনেকটা ছোট বোনের মত, বেশ বকাবকি করে, আর মাঝে মাঝে এরকম মান-অভিমান দেখায়।

কয়েক সেকেন্ডের জন্যে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম বোধহয়। ঝুমুরের কথায় সম্বিত ফিরল।

“দাদা, মিচকি মিচকি হাসছো কেন বলতো?!”

নিজেই খেয়াল করিনি কখন যেন ঠোঁটের কোনে অজান্তেই হাসি লেগে গেছিল।

ঝুমুরের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে বললাম, “কিছু না রে, এমনি”।

ঝুমুরের বয়েস বছর সাড়ে চারেক হলে কি হবে, সে মহা পাকা। গাছেদের ক্ষেত্রে সাড়ে চার খুবই অল্প বয়েস হবার কথা। কে জানে, এঁচোড় পাকাই হবে বোধহয়।

একটা ব্যাঁকা হাসি হেসে ঝুমুর বলল – “কিছু না বললেই হল!! আমি সব বুঝি।
বলো না, কারুর কথা মনে পড়ল বুঝি?”

মনে পড়া!!

নিজের মনেই হাসলাম। মনে তো তখনই পড়ার প্রশ্ন আসে যখন লোকে ভুলে যায়।

কিন্তু ঝুমুরকে এত কিছু বুঝিয়ে লাভ নেই। আজ বোধহয়, কেন জানিনা, ঝুমুরের ওই ছোট্ট কথাটায় মনটা অনেকদুর চলে গেছিল।

তাই বললাম, “হ্যাঁ, তা পড়ল। অনেকদিন আগে, আমার এক বন্ধু ছিল। তার কথা ভেবে হাসলাম।”

“তাই?? তা সে কিরকম বন্ধু ছিল গো? খুব কাছের বন্ধু?”

কঠিন প্রশ্ন।

মানে, ঠিক কঠিন নয়, কিন্তু সমস্যাটা এই যে উত্তরটা চট করে কাউকে বোঝানো খব মুশকিল, তাই কঠিন।

বললাম, “কিরকম বন্ধু, কি করে বোঝাই বলত? বোঝালে কি তুই বুঝবি?”

বনসাই ঝাউগাছটা দেখলাম একটু ডানদিকে হেলে গেল সামান্য। ঝুমুর বোধহয় গালে হাত দিয়ে বসল, ইন্টারেস্ট পেয়েছে নিশ্চই।
নিজের মনেই একটু হেসে আবার বললাম।

“তোর এই রাগ করা দেখে মনে পড়ল, সেও এরকম কথায় কথায় খুব রাগ করত আর ঝগড়া করত। বাচ্চাদের মতই।”

“ওয়াও, খুব ভালো বন্ধু তো গো দাদা!!?” – ঝুমুরকে খুব উত্তেজিত দেখালো।

“ভালো কি মন্দ বলতে পারব না, তবে মাথার সব চুল তুলে দিয়েছিল বটে আমার। প্রচন্ড রেগে যেত যদি তার একটুও মনে হত যে আমি কাউকে তার থেকে বেশী গুরুত্ব দিচ্ছি। একদম ক্ষেপি।”

কেমন যেন মনে হল ঝুমুর জিভ কাটলো।

আকাশটা সকাল থেকেই মেঘলা। চারিদিকে কেমন যেন গুমোট ভাব। মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকালাম। দুটো কাকা উড়ে গেল কা কা করতে করতে। রাস্তার ধারের কৃষ্ণচুড়া গাছটাতে অনেক ফুল হয়েছে, ঠিক যেন আগুন লেগেছে সমস্ত গাছটাতে।
ঝির ঝির করে কেঁপে উঠল পাতাগুলো, মৃদুমন্দ হাওয়া বইছে, অনেকদিন পরে।

“কতদিন আগের কথা গো দাদা?”

চটকা ভাঙ্গল ঝুমুরের কথায়। বেচারা অনেক্ষণ চুপ করে ছিল, ভাবছিল আমি কিছু বলব, কিন্তু তারপর  আর ধৈর্য ধরতে পারেনি বোধহয়।

কতদিন আগে?
সময়ের হিসেব কি করে করি, যেখানে সময় থমকে আছে আজও!

ঝুমুরের দিকে তাকিয়ে বললাম, “তা হবে, আমি তখন ৩১-৩২ হব”।

ঝুমুর খানিক্ষণ চুপ করে থেকে জিগ্যেস করল – “তোমরা খুব গল্প করতে নিশ্চয়ই?”

“হুম, তা তো করতাম”

“কি গল্প গো, বল না”

“গল্প আর কি!! যেরকম সবাই করে সেরকম গল্প”

“দূর বাবা, এ তো আচ্ছা মুশকিল হল, গলায় কি ব্যাঙ ঢুকেছে নাকি!!” – ঝুমুরকে বেশ রাগান্বিত মনে হল।

আমি হেসে বললাম, “আচ্ছা ঝুমুর, সে গল্প কি আর একটা রে, কি করে বলি বলতো? সে অনেক গল্প, তার না আছে কোনো মাথা, না আছে কোনো মুন্ডু। বকতে বকতে যে কখন সময় পেরিয়ে যেত টেরই পেতাম না। কখনও কাজের গল্প, কখনও বইয়ের, কখনও গানের, কখনও খাবারের, আবার কখনও আমার গল্প, তার গল্প, আমাদের গল্প, বৃষ্টির গল্প, রোদ্দুরের গল্প, সবুজ উপত্যকা বা রুক্ষ মরুভুমির গল্প।”

...
...

কখন হালকা বৃষ্টি আরম্ভ হয়েছিল খেয়ালই করিনি। গালে হালকা জলের ছিটে লাগতে বুঝলাম। ঝুমুরের পাতাগুলোও ভিজে গ্যাছে একটু, টুপটাপ করে জল পড়ছিল ওর পাতাগুলো থেকে।

অনেক্ষণ চুপচাপ বসে ছিলাম। কতক্ষণ সময় কেটে গেছিল তার খেয়াল ছিল না। ঝুমুরও কোন কথা বলেনি এতক্ষণ। কি ভাবছিল কে জানে!

“আসলে, আমি বোধহয় ভালো বন্ধু ছিলাম না।”

“কেন?” – ঝুমুরকে একটু গম্ভীর লাগল।

“ভালো বন্ধু তো তার বন্ধুকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে, দ্বিধায় ফেলে পেছনে টেনে ধরে না”

“কেন, তুমি কি পেছনে টেনে ধরেছিলে?”

“সেটা ঠিক জানি না, তবে দ্বিধায় ফেলেছিলাম এটা নিয়ে তো কোন সন্দেহ নেই”

ঝুমুর আর কিছু প্রশ্ন করল না এটার পর। এত কঠিন কথাবার্তা শুনে ঘেঁটে গিয়েছিল বোধহয়।

আমিও ভাবছিলাম, কেন তৈরি হয়েছিল দ্বিধা।

এ পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষ যখন অন্যদের সঙ্গে মেশে, কথা বলে, তাদের মধ্যে অনেকগুলো স্তর থাকে। আসল মানুষটা, যে সবসময় একটা সাদাকালো চরিত্র, সে কখনই বাইরে আসে না। তবে, কখনও কখনও, খুব কম ক্ষেত্রে, কখনও কেউ কেউ পেয়ে যায় এমন কাউকে, যার সামনে সেই আসল মানুষটা বেরিয়ে আসতে পারে নির্দ্বিধায়। আর তখন, সেই দুটো মানুষ জুড়ে যায় এমন একটা মনের স্তরে, যেটা অবিচ্ছেদ্য, আর চিরকালীন।
কিন্তু এই স্তর তো শুধু সেই দুটো মানুষের জন্যে, আর কেউ বোঝে না তার অস্তিত্ব। আর, সত্যিই তো, পৃথিবীটা তো আর শুধু দুজন মানুষকে নিয়ে চলে না।

“কি হয়েছিল, তারপর?”

“কি আবার হবে? হবার আছেটা কি এর মধ্যে?”

“নেকামো কোরো না!! আমি জিগ্যেস করছি কি হল তোমার বন্ধুর, তারপর?”

“শোন ঝুমুর, জীবনে এগিয়ে যেতে গেলে পুরোনো জিনিস অনেকসময় ফেলে দিতে হয়, বোঝা কমাতে হয়, কেটে ফেলতে হয় পুরোনো সম্পর্ক, যা কাউকে পিছনে টেনে ধরে।”

“বাহ, ছেড়ে চলে গেল?!”

“আহ ঝুমুর, বাজে কথা বলিসনা, এর মধ্যে ছেড়ে যাবার কি আছে!! যেটা বুঝিসনা সেটা নিয়ে কথা বলিস কেন?”

একটু বেশীই ঝাঁঝিয়ে বলে ফেলেছিলাম কথাটা। খারাপ লাগল ঝুমুরকে চুপ করে থাকতে দেখে।

তাই একটু পরে বললাম, “আচ্ছা চল, আমি আবার একটু বইটা পড়ি, বুঝলি?”

...
...

“থাকো তো একা, সেরকম কাছের বলতে কেউ নেই তোমার, কেউ কিছু পাঠায়ওনা তোমাকে, ওই মোটা কালো ফ্রেমের চশমাপরা দাদু শুধু মাঝে মাঝে ইমেল করে তোমাকে, আর ওই দুটো ছোঁড়াছুঁড়ি, ওই কি পিং না টিং কি বলে – সেসব করে, তাহলে, প্রতি বছর ১৩ ই জুন নিয়ম করে লেটারবক্সের চাবি খুলে কি দেখো?”

একটু হাসলাম, কিন্তু আর বললাম না ঝুমুরকে, যে, ওই একটাই এক্সপেক্টেশন আজও রয়ে গেছে। এটা একমাত্র একজন ছাড়া আর কেউ বুঝবে না।

মুখের উপর একটা হালকা রোদ এসে পড়ল। মেঘ সরে গিয়ে রোদ উঠেছে। আর গুমোট নেই চারিদিকে।
পাশের বাড়ী থেকে কেউ একটা গান চালিয়েছে। জন ডেনভার গাইছেন...

“Sunshine, on my shoulders makes me happy
Sunshine, in my eyes can make me cry
Sunshine, on the water look so lovely
Sunshine, almost always makes me high”

Sunday, April 26, 2015

বিস্মৃত

নামটা ঠিক মনে পড়ছে না এখন।

ভাড়া বাড়িতে থাকতাম, সোজা গলির শেষ প্রান্তে। পুরো গলিটা দেখা যেত দরজাটা খুলে সামনে বসে থাকলে।

ছেলেটা দুপুরবেলা আসতো।

এসে একটা হাঁক ছাড়তো – “ঠাকুমাআআআ”।

আমার ঠাম্মা ঘরেই থাকতো, হয়েত বসে বই পড়তো, বা কখনও ঊর্দু শিখত নিজে নিজেই।

আমাদের ডাকটা অভ্যেস হয়ে গেছিল।

দরজা খুললে দেখা যেত সে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে – আমার বয়েসিই ছিল, সাইকেল করে আসত, তাতে অনেকগুলো মাঝারি থলে ঝুলত, তার মধ্যে থাকত চানাচুর, বিভিন্ন ধরণের – সেগুলো সে বেচতে আসত।
 
সব বাড়ি সে ঘুরত না, শুধু কয়েকটা বাড়ি তার চেনা ছিল, সেখানেই সে বেচত।

না, শুধু চানাচুর বেচত না, সঙ্গে অনেক গল্পও করত।

তার বাড়ির গল্প, তার মায়ের গল্প, আর তার ফুটবল খেলা শেখার ইচ্ছের গল্প। তখনও অতটা বুঝতাম না, কিন্তু ছেলেটা বেশ অন্যরকম ছিল, একটা আত্মসম্মান-ওয়ালা ছেলে, জীবন যুদ্ধে সোজা হয়ে লড়ে যাওয়া একটা ছেলে।

প্রায়ই আসতো, গল্প করে যেত, আর কিছু চানাচুর রেখে যেত।

বেশ ভাল লাগত, ছেলেটা এলে, গতানুগতিক জীবনের বাইরে একটা অন্যরকম হাওয়া।

তারপর, একদিন হঠাত খেয়াল হল একদিন, ছেলেটা অনেকদিন যেন আসেনি।

ঠাম্মা জিগ্যেস করল, ২ সপ্তাহ আগে এল – তাই না রে কাজল?

আমি মনে করার চেষ্টা করলাম, বললাম, হ্যাঁ, ওইরকমই হবে।

আমরা ভাবতাম, এই হয়েত আসবে, হয়েত ফুটবল খেলার সুযোগটা পেয়েছে, আসবে কয়েকদিন পরে।

অপেক্ষা করতাম।

কিন্তু, সে আর আসেনি।

নামটা তখন জানতাম, কিন্তু – আজ আর মনে নেই।

অথবা, উত্তরপাড়া লাইব্রেরীর মাঠে যখন বিকেলে খেলা হত, একটা ছোট্ট ছেলে, ১০-১২ বছর বয়েস হবে, লাইব্রেরীর সিড়িতে বসে আমাদের খেলা দেখত, গালে হাত দিয়ে।

একদিন, খেলার পরে, গিয়ে বসলাম ছেলেটার পাশে।

অন্ধকার হয়ে আসছিল, মাথার উপর কিছু মশা ঘুরে বেড়াচ্ছিল, রোজকার মতন।

হাতের ক্যাম্বিস বলটা ছেলেটাকে দিলাম।

একগাল হেসে নিল।

জিগ্যেস করলাম – বসে থাকো যে এখানে, খেলবে কাল থেকে আমাদের সঙ্গে?

মুখটা হাসিতে ভরে উঠল, বলল – “হ্যাঁ, খেলব, তবে...বাবা বলেছে, যে অসুখ সেরে গেলে তারপর খেলতে”।
 

আমি বললাম, বেশ তো, তাই নাহয় হবে।

কিন্তু বললে না তো – তোমার কি হয়েছে...

ছোট ছেলে তো – প্রশ্নটা শুনে একটু সামস্যায়ে পড়ে গেল বোধহয়।

মাথার টুপিটা খুলে কয়েকবার মাথাটা চুলকে নিল। 

আর আমি খানিক্ষন অর চুলবিহীন ছোট্ট ন্যাড়া মাথাটার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

খানিক্ষণ পরে জিগ্যেস করলাম – তোমার নাম কি?
 
বলেছিল, কিন্তু আজ আর মনে নেই।

 

আমরা আসলে অনেক কিছু ভুলে যাই, জীবনের স্রোতে অনেক কিছু ভেসে যায়, এটা বোধহয় স্বাভাবিক, কিম্বা নয় – বলতে পারবো না ঠিক।

ছেলেরা যেমন, বিয়ের পরে বিয়ের দিন ভুলে যায় (কেস তারপর কি খায়ে মোটামুটি সবারই জানা আছে, খোলসা করছি না আর এখানে), বউ-র জন্মদিনও মাঝে মাঝে ভোলে (সেম রেজাল্ট), অফিসে বস-র দেওয়া কাজ করতে ভুলে যায় (পাশের মেয়েটার “একটু করে দাও না এটা” বলে দেওয়া কাজটা কিন্তু ভোলে না – কি করা যাবে, ইনসেনটিভ চাই তো নাকি!!), আবার অফিস থেকে বেরিয়ে পাব-এ ঢুকে তারপর বাড়ী ফেরার রাস্তাটা ভুলে যায়।

মেয়েরা যদিও কিছুই ভোলে না, এবং সেটাই সবথেকে বড় সমস্যা। এর জ্বালায়ে ছেলেদের নিজের নাম ভুলে যাবার জোগাড় প্রায়।

 
তবে, এই ভুলে যাওয়াগুলো বেশ মজার, একদিক থেকে দেখতে গেলে।

কারণ, পরে, মনে পড়লে, আমরা নিজেরাই হাসি, এই ভুলে যাওয়া আর তার পরিণাম মনে করে।
 

কিন্তু, কখনও কখনও স্বপ্ন ঘিরে ধরে, আবছা ধোঁয়াশা, যেন একটা মশারীর মধ্যে দিয়ে দেখা – সেই দৃশ্যগুলো, কিছুতেই যেন মনে পড়তে চায় না, ধরা দিয়েও ধরা পড়েনা – সেই ভুলে যাওয়াগুলো, মজা দেয় কি? হয়েত না, জানি না।

 

আস্তে আস্তে বিস্মৃত হওয়া নাম, ঘটনা, দিন, বন্ধু, সময় – সব ভেসে যায় – হয়েত পরে কোনদিন মনে পড়বে যেটা চাই মনে করতে, পাড়ে এসে ঠেকবে স্মৃতিগুলো, কিন্তু তখন হয়েত অনেক দেরী হয়ে যাবে।

 

নাহ, দেখেছেন তো, নামগুলো কিছুতেই আর মনে পড়ল না!!

তবে মনে পড়লে, অবশ্যই আপনাদের জানাবো।

শুঁটকিমাছ

পশ্চিমবাংলার বাইরে, বিশেষত দক্ষিণে আর পশ্চিমে, বাঙালীদের নিয়ে একটু-আধটু খিল্লি যে হয়ে থাকে এটা সবার-ই জানা, যেমন আমরা ওদের নিয়ে করে থাকি আর কি।

তা, “কুঁড়ে”, “ভাবুক-চন্দর”, “বাবু”, এই মধুর তকমাগুলো বাঙালীদের সম্বন্ধে শুনলে এঁড়ে তক্ক করা ছাড়া আর কিছু করার খুব একটা থাকে না। 

কিন্তু একটা ব্যাপার আছে, যেখানে এঁড়ে-বেঁড়ে যে তক্কোই হোক না কেন, কেউ কিছু বললে মাঝে মাঝে রক্তারক্তি হয়ে যাবারও সম্ভাবনা থাকে।

“মেছো-বাঙালী” -  আমার সমস্ত অবাঙালী বন্ধুরা এবং বাকিরা – ভেবেচিন্তে বলবেন, মাইরি বলছি।

গড়পড়তা বাঙালীর পাতে মাছ থাকাটা রোজকার ব্যাপার।

রুই-কাতলা-মৃগেল-ভোলা-ভেটকি-পাবদা-তেলাপিয়া-পমফ্রেট-চিংড়ি-ইলিশ, এসব বাঙালীর জীবনের নিত্যসঙ্গী।
যেকোনো দুই বাঙালীকে মাছ নিয়ে কথা বলতে বসিয়ে দিন, গোটা একটা বেলা কেটে যাবে, কিন্তু তাও আগামী এক মাসের যুক্তিতক্কো বাকি থাকবে।

আর, এই মাছেদের মধ্যেও শ্রেণীবিভাগ আছে, অনেকটা ওই বামপন্থী রাজনীতির মত (আমি কিন্তু রাজনীতির ব্যাপারে মূর্খ্যই বলতে পারেন, তাই দয়া করে মানহানির মামলা করবেন না)।

রুই-কাতলা-মৃগেল-মৌরলা – এরা হচ্ছে ওই শ্রমিক-কৃষক শ্রেণী। শ্রেণী রাজনীতি নিয়ে এর থেকে বেশী জানতে চাইলে, মার্ক্সবাদ পড়ে নেবেন, আর মাছ নিয়ে আরও জানতে চাইলে বলবেন – পরে আর একটা নাহয় লিখব সব মাছেদের নিয়ে।

পমফ্রেট-পাবদা-ভোলা-ভেটকি – এরা হল ওই মধ্যবিত্ত শ্রেণী, তবে পুঁজিবাদী বোধহয় বলা যায় না এদের।

আর, ইলিশ-চিংড়ি, এরা হল মাছেদের সমাজে এলিট শ্রেণী।

বোধহয় একটু ভুল বললাম।
এরা মাছেদের সমাজে নয়, মনুষ্য সমাজের ক্ষেত্রেই শ্রেণী বিভাজনটা করে থাকে সাধারণত। তবে, সেই কচকচি আরেকদিন হবে নাহয় পরে।

কিন্তু, এই যে ইলিশ-চিংড়ি, এরা হল গিয়ে আইকনিক, মেগা-স্টার বলতে পারেন।
এদের নিয়ে বাঙাল-ঘটি, ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান – এরকম হাই-ভোল্টেজ ক্যাচড়া তো অতি পরিচিত বাঙালী সমাজে।

তবে, যেটা কোনদিনই খুব একটা তক্কে আসে না, সেটা হল শুঁটকি মাছ।

এই বস্তুটি কিন্তু পূর্ববঙ্গের লিগ্যাসি। বাঙালদের খাস বিলাসিতা বলতে পারেন।

এরকম একটা বিতর্ক তো আছেই যে, পদ্মার ওপারে বাঙাল, আর এপারে নয়।

আমি কিন্তু এপার-ওপার কোনটাই নই, জন্মও বাংলাদেশে নয়, কিন্তু জন্মসূত্রে বাঙাল বটে।

আর শুঁটকি মাছ আমার জীবনের সেরা খাবারগুলোর মধ্যে একদম উপরে আছে। আর আমি কিন্তু বহু জায়গার বহু খাবার খেয়েছি, আমাকে কুঁয়োর ব্যাঙ ভাববেন না মোটেও।

তাই, বাঙাল আর শুঁটকি মাছ যে একাত্মা, এই ব্যাপারে আমার খুব একটা সন্দেহ নেই। সুতরাং, আপনি যদি নিজেকে বাঙাল মনে করেন, কিন্তু শুঁটকি মাছ ভালো না বাসেন, দয়া করে ঘরের কোনায় গিয়ে মুখ লুকোন, কারণ এই নিয়ে আমাকে কিছু বলতে আসলে আপনার ইজ্জত নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে এটা আগেই বলে দিলাম কিন্ত।

তো, যাই হোক, এই শুঁটকি মাছ জিনিসটা বেশ মজার। একটু বলি বরং।

সাধারণত, লৈট্যা, লাক্কা আর চিংড়ি – এই তিন ধরনের মাছ থেকেই শুঁটকি তৈরি হয়। ব্যাপারটা কিছুই নয়, এই মাছগুলোকে বেশ অনেকদিন ধরে তেড়ে শুকোনো হয়। তারপর যখন মাছগুলোর মধ্যে আর কোন রসকষ বাকি থাকে না, তখনই ওগুলোকে বাজারে পাঠানো হয় খাদ্যরসিকদের রসনার রসস্বাদন করার জন্যে।

এই শুঁটকি মাছের বেশ চড়া দুর্নাম আছে মার্কেটে। কারণটা বুঝতে আমার ছোটবেলায় বেশী সময় লাগেনি, ঘটনাটা একটু বলি।

বাড়িতে শুঁটকি মাছ রান্না হচ্ছে একদিন সকালে। ভাড়া বাড়ী ছিল, আমরা নিচের তলায়, বাড়িওলরা উপরে। রান্না তখন মাঝামাঝি জায়গায়, চারিদিক বেশ ম-ম করছে, হঠাৎ দেখি বাড়িওয়ালা মাসিমা নাকে কষে আঁচল চাপা দিয়ে নিচে নেমে এসেছেন, আর আমার মা-কে বলছেন – “আঁরঁতিঁ, তোঁমাঁর রাঁন্নাঘঁরে কিঁ কিঁছুঁ পঁচেছেঁ? আঁমরাঁ উঁপর থেঁকেঁ এঁকটা ভঁয়ঙ্কঁর মঁড়াপঁচা গঁন্ধ পাঁচ্ছি।”

খুব একটা অতিরঞ্জিত ছিল না বোধহয় ব্যাপারটা। আসলে, যারা কোনদিন এই বস্তুটির সঙ্গে পরিচিত হয়েনি, তাদের ক্ষেত্রে শুঁটকি মাছ রান্নার সময়ের গন্ধটা সহ্য করাটা অনেকটা ভুতেদের মোচ্ছবে বসে থাকার মতই লাগে হয়ত।

কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমার চরম লাগত ওই গন্ধটা।

শুঁটকি মাছ রান্নার গন্ধ নাকে ঢোকা মানেই আমার খিদে পাওয়া শুরু। সেই খিদে ওই যে সকাল ১০-১১ টা থেকে পেতে শুরু করত, আগ্নেয়গিরির লাভার মত সেই খিদেটা ১-টা নাগাদ দুপুরের খাবার পাতে বিস্ফোরন হত। রোজ যা ভাত খেতাম, এই দিনটাতে তার থেকে অন্তত দ্বিগুণ খাওয়াটা অবশ্যম্ভাবী ছিল।
খাওয়ার পাতে, ওই যে একটা লালচে, তেল-রগরগে, বিষম ঝাল বস্তু পাতে এসে পড়ত, তার যে কি স্বাদ, সে যে কি জিনিস, মাইরি বলছি, আমার অত ক্ষমতা নেই যে সেটা আপনাদের লিখে বোঝাব।

সেটা বুঝতে গেলে আপনাদের ওই স্বর্গীয় বস্তুটির রসস্বাদন করা ছাড়া অন্য কোনো রাস্তা নেই।

বেশ অনেক রকম শুঁটকি মাছের রান্নাই আমি খেয়েছি, এদিক-ওদিক অনেক বাঙালদের হাতে, কিন্তু, মা যেটা বাড়িতে বানাতো, সেটা একটা অন্য জিনিস ছিল, একদম অন্য জিনিস।

অনেকবার মা খাইয়েছে সেই শুঁটকি মাছ।

একদিন বলল, আগামী রবিবার করব, আসিস খেতে।

সেই রবিবারটা এসেছিল ঠিকই, কিন্তু শুঁটকি মাছ রান্না করার জন্যে মা আর ছিল না।

স্বাদটা চিরকাল মনে থাকবে।

তাই কিছুদিন ধরেই ভাবছিলাম, যে অনেকদিন খাওয়া হয়নি, একদিন চেষ্টা করেই দেখি না রান্না করার।

রান্না তো আর শুধু রেসিপি নয়, তার সঙ্গে স্মৃতিও, হয়ত ওরকমই বানিয়ে ফেলব।